ঢাকা রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
হবিগঞ্জ: নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত দিনারপুর পরগনায় আবারও রাতে বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড়ের লাল মাটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি বিদ্যুৎ প্লান্টে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের ঝুঁকি বাড়ছে।
বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নিয়ে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে একটি বিশাল পাহাড় কাটার সময় স্থানীয় জনতা বাধা দেন। তবে পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা টিলা বা পাহাড় কাটার কোনো অনুমতি দিতে পারে না। বাড়ি নির্মাণের জন্য আবেদন করায় শ্রেণি পরিবর্তন না করে পাহাড়ে একটি বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই অনুমতিপত্র ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় কাটার খবর পাওয়ার পর অনুমতিটি স্থগিত করে পাহাড় কাটা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের নজর এড়াতে গত শুক্রবার ছুটির দিনে রাতে দিনারপুরের আইনগাঁও এলাকায় জনৈক আব্দুল আহাদের মেয়ে রুনু বেগমের লোকজন এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে দেদার পাহাড় কাটেন। রুনু বেগম সম্প্রতি নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে টিলায় বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন অনুমতি দেন। সেখানে তিনি লেখেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ (সংশোধনী)-এর ৭(ক) ধারা অনুযায়ী শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হলো।
ওই অনুমতি পাওয়ার পর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নতুন নির্মিত বিদ্যুৎ প্লান্টে পাহাড়ের লাল মাটি বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত শুক্রবার সরকারি ছুটির রাতে মেশিন দিয়ে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকে করে তা বিক্রি করা হয়। এ সময় ড্রাম ট্রাকের আঘাতে গ্রামের চলাচলের সড়কটি সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। পরে গ্রামবাসী বিষয়টি নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি রাতেই পাহাড় কাটার কাজ বন্ধ করে দেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতা এবং দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলির কারণে এমন কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া, গজনাইপুর ও পানিউমদা ইউনিয়ন নিয়ে দিনারপুর পরগনা গঠিত। এটি উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ২০১৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন দিনারপুর এলাকার টিলা ও পাহাড় কাটা বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে রিট করে। এ ব্যাপারে হাইকোর্ট স্থিতাবস্থা দিয়ে রুল জারি করেন।
রুলের শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায়ে নবীগঞ্জের দিনারপুরে পাহাড় ও টিলা কাটা রোধে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া তৎকালীন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বছরের অধিকাংশ সময় দিনারপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে মাটির ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ২ অক্টোবর রাত থেকে দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাঁও গ্রামে একটি বৃহৎ পাহাড় কাটা শুরু হয়। আইনগাঁও গ্রামের আব্দুল্লাহ বলেন, গ্রামের প্রভাবশালীরা রুনু বেগমের নামে অনুমতি এনে সালেহ, শায়েম, আউয়াল ও আশরাফ আলীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এক্সকাভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে পাহাড় থেকে মাটি কাটছে। পরে ট্রাকভর্তি মাটি পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এতে গ্রামের রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে এবং প্রতিবাদ করলে তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মুরব্বি আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, পাহাড় কাটার ফলে আশপাশের বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থেমে থেমে পাহাড় কাটা হলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
গজনাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের কায়েদ বলেন, তাঁদের এলাকায় এভাবে রাতে পাহাড় কাটা ভয়ংকর বিষয়। আইনগাঁওয়ে যারা পাহাড় কাটছে, তারা রাজু, সালেহ, শায়েম, আউয়ালসহ আরও অনেকে। রাজুদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা আছে বলেও তিনি জানান। তাঁদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনের নজর এড়াতে সরকারি ছুটির দিনকে বেছে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ছুটির দিনে রাতভর পাহাড় কাটা হয়।
অভিযুক্ত রুনু বেগম বলেন, ‘প্রয়োজনে আমার মালিকানাধীন পাহাড় থেকে মাটি কাটছি, মাটি পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ অফিসে আমার দেবররা বিক্রি করছে। আমি বাড়ি নির্মাণের অনুমতি পেয়েছি, কিন্তু ব্যবসার জন্য মাটি বিক্রি করা নিষেধ জানি না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, বাহুবল, চুনারুঘাট ও মাধবপুরে পাহাড়, টিলা কেটে পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে বহু বছর ধরে। এতে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। নবীগঞ্জে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যত কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না, দ্রুত দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থাসহ পাহাড়-টিলাকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’ আর না হলে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় বলেন, রাতে পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। রুনু বেগম যদি বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নিয়ে তা অপব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁকে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, ‘আমরা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ (সংশোধনী)-এর ৭(ক) ধারা অনুযায়ী শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দিয়েছি। এখানে পাহাড় বা টিলা কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। সে যদি আমাদের অনুমতির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করে থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়ার অধিকার নেই। সরেজমিন তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর অনুমতিপত্র স্থগিত করা হয়েছে, তাঁকে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এর পর কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ০:৪৮:৩৭ ৯ বার পঠিত | ● নবীগঞ্জ ● বিক্রি ● মাটি