ঢাকা রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুড়িগ্রাম: উলিপুরে অবাধে চলছে বাল্যবিয়ে। এনজিওগুলোর কার্যক্রম বন্ধ, ইউনিয়ন পরিষদের অচলাবস্থা ও সরকারি তৎপরতার অভাবে অনেকটা প্রকাশ্যেই হচ্ছে এসব বিয়ে। ফলে বালিকা মাদরাসা ও বিদ্যালয়গুলোতে মেয়ে শিক্ষার্থীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়ছে অনুপস্থিতির হার, আশঙ্কাজনকভাবে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। গত দুই বছরে উপজেলায় ৪৭৯টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরোধ করা হয়েছে মাত্র ৪০টি। যার অধিকাংশেরই পরে বিয়ে হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এসব অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বাল্যবিয়েকে দায়ী করেছেন।
আরডিআরএস সংস্থার ‘চাইল্ড নট ব্রাইড’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের শেষ নাগাদ উপজেলায় ৭৩টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। ব্র্যাকের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে ৩৩টি বাল্যবিয়ে হয়েছে এবং ১০টি বিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে। উপজেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক বিভাগ তিন বছরে একটি বিয়ে প্রতিরোধ করেছে। এ ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই বলে জানানো হয়েছে।
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে নারী নির্যাতন ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ হতদরিদ্র পরিবারের ৬ হাজার কিশোরী শিক্ষার্থীকে নিয়ে ৬০টি কিশোরী ক্লাব গঠন করে। ২০২৫ সালে এসব ক্লাব ২৬টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই লেখাপড়া করছে। তবে পরবর্তীতে কয়েকজন মা-বাবার সঙ্গে অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ায় পুনরায় বিয়ে হয়েছে বলে জানান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি উপজেলার ৮টি বালিকা মাদরাসা ও বিদ্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানান, এ চিত্র প্রতিদিনের। অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে জানতে পেরেছেন, অনুপস্থিতদের অধিকাংশই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের তুলনায় মাদরাসাগুলোতে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেশি। মাদরাসায় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বেশি বাল্যবিয়ে হচ্ছে। আর বিদ্যালয়ে নবম থেকে দশম শ্রেণিতে বিয়ে হচ্ছে—অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদরাসায় ৬০ জন, নন্দু নেফরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৩ জন, গুনাইগাছ রহমানিয়া বালিকা দাখিল মাদরাসায় ২০ জন, রাজবল্লব বালিকা দাখিল মাদরাসায় ৪০ জন, চর কলাকাটা গনি মিয়া দাখিল মাদরাসায় ১৫০ জন, হযরত ফাতেমা (রাঃ) স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫৫ জন, বাকরের হাট বালিকা বিদ্যালয়ে ৫ জন এবং হাতিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ জনের বাল্যবিয়ে হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা জানান।
হযরত ফাতেমা (রাঃ) স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মানছুরা আক্তার হিমু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘স্যার, এই মরণব্যাধি থেকে আমাদের বাঁচান। আমাদের মা-বাবারা সচেতন না হলে আমরা এর থেকে রেহাই পাব না। আমিও এর শিকার হওয়া থেকে কোনো রকমে রেহাই পেয়েছি।’
চর কলাকাটা গনি মিয়া দাখিল মাদরাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেধাবী তাসনিয়া আক্তার কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ডাক্তার হব। কিন্তু সে স্বপ্ন আমার ধূলিসাৎ হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছে। বিয়ে থেকে বাঁচার অনেক চেষ্টা করেছি, পারিনি। বাবার বাড়িতে মেয়েরা বড় অসহায়। তবে আমি বলেছি, লেখাপড়া করব।’
আপুয়ার খাতা আমেনা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোমা আক্তারের মা হতদরিদ্র রত্না বেগম বলেন, ‘আমরা খুব অনুতপ্ত। মেয়ের বাল্যবিয়ের সব ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু কিশোরী দল সেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। তখন মনটা খুব খারাপ হয়েছিল। এবার মেয়ে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করায় মনটা খুশিতে ভরে গেছে। মেয়ে কয়, মা, আমি অনেক লেখাপড়া শিখি, চাকরি করি, তোমার অভাব দূর করমো। এখন ভুল বুঝতে পারছি। বিয়ে হলে মেয়েটার সব স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যেত। ওর জীবনটাও মাটি হয়ে যেত।’
হযরত ফাতেমা (রাঃ) স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাফেজ রুহুল আমিন বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু বাল্যবিয়ে ঠেকানো যাচ্ছে না। বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষার্থী দিন দিন কমছে। এনজিওগুলোর প্রকল্প শেষ, ইউনিয়ন পরিষদের ভঙ্গুর অবস্থা ও সরকারি তৎপরতা না থাকায় বাল্যবিয়ে বেড়েছে।’ তিনি এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও সরকারি তৎপরতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তা না হলে নারী শিক্ষা পিছিয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চর কলাকাটা গনি মিয়া দাখিল মাদরাসার সুপার মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘দুর্গম এলাকার এ প্রতিষ্ঠানে প্রচুর মেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কিন্তু বাল্যবিয়ের প্রবণতা এখানে অনেক বেশি। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতামূলক অভিভাবক ও মা সমাবেশ এবং এনজিওদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেও কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না। আগে চুপচাপ হতো, এখন প্রকাশ্যে বাল্যবিয়ে হচ্ছে।’ আইনি সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করে তিনি আইনি তৎপরতা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর দাবি জানান।
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ প্রাইজ প্রজেক্ট উলিপুরের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার বাল্যবিয়েপ্রবণ পাঁচটি ইউনিয়নে শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০টি কিশোরী ক্লাব গঠন করা হয়েছে। এসব ক্লাবের মাধ্যমে মা-বাবাদের সচেতন করার পাশাপাশি ৬ হাজার পরিবারকে খাদ্য ও উপবৃত্তি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিশোরী ক্লাব ২৬টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছে। ছয়জন মা-বাবার সঙ্গে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। অন্যরা লেখাপড়া করছে। তবে সরকারি সহায়তার ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।
উপজেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিম আল মোস্তাকুর বাল্যবিয়ে বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমি চার উপজেলার দায়িত্বে আছি। তাছাড়া কোনো অফিসে জনবল নেই। কীভাবে কাজ করব? এনজিওগুলো না থাকায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আরিফ বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর এলেই আমরা আইনিভাবে বিয়ে বন্ধ করে দিই। কিন্তু খবর না পেলে কী করার আছে। এ বিষয়ে মহিলা বিষয়ক, তথ্যকেন্দ্র ও জাতীয় নারী সংস্থা কাজ করছে।’ বিয়ে বেড়েছে না কমেছে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ০:৫৫:২৫ ৬ বার পঠিত | ● উলিপুৃর ● ছোবল ● বাল্যবিয়ে