ঢাকা রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
পটুয়াখালী: বাউফলের ১২১ নম্বর বগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। শ্রেণিকক্ষগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের আঙিনায় নেমে এসেছে অন্যরকম এক বিকেল। কারও চোখে জল, কারও হাতে ফুল, আবার কেউ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন প্রিয় একজন প্রিয় মানুষের বিদায়ের মুহূর্ত।
সেদিন ছিলো প্রায় চার দশক ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর হাতে বর্ণমালা তুলে দেওয়া প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগমের শেষ কর্মদিবস। আর সেই বিদায় মুহূর্তেই ঘটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা—যা উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে দীর্ঘদিন রয়ে যাবে।
বৃহস্পতিবার, ২১ মে প্রধান শিক্ষক কহিনুর বেগমের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদ করিম। সাধারণত এমন অনুষ্ঠানে অতিথিরা বক্তব্য দেন, শুভেচ্ছা জানান, ফুল তুলে দেন। কিন্তু তিনি যেন সেদিন দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন একজন সহমর্মী সহযাত্রী। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেননি তিনি। বক্তব্যের সময় এলে তখন তিনি বলেন, “অবসরজনিত ছুটির জন্য সকলের প্রিয় শিক্ষককে কষ্ট করে আমার অফিসে যেতে হবে না। আমি আজ এখানেই তার ছুটি মঞ্জুর করে দিলাম।”
মুহূর্তেই চারপাশে নেমে আসে বিস্ময় আর করতালির ঢেউ। তিনি সঙ্গে থাকা সহকারীকে ডেকে প্রয়োজনীয় চিঠি প্রস্তুত করতে বলেন। অনুষ্ঠানস্থলেই সম্পন্ন হয় অবসরজনিত ছুটি মঞ্জুরের আনুষ্ঠানিকতা। একজন শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিনে এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে,এমন প্রশ্নই ঘুরছিল উপস্থিত অনেকের মুখে। তবে ঘটনাটির আবেগময় অধ্যায় তখনও বাকি ছিল।
অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজেই বিশেষ সন্মানের সাথে কহিনুর বেগমকে গাড়িতে ওঠান। এরপরে মাসুদ করিম নিজে বসেন গাড়ির স্টিয়ারিং সিটে এবং প্রায় তিন কিলোমিটার পথ গাড়ি চালিয়ে শিক্ষক কহিনুর বেগমকে বাড়ি পৌঁছে দেন তিনি।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন আচরণ উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করেছে। কেউ মোবাইলে সেই দৃশ্য ধারণ করেন, কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন, সবার চোখে মুখে ফুটে উঠেছিলো আবেগ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক’রা বলছিলেন, বিদায় সংবর্ধনা অনেক দেখেছেন, কিন্তু এমন সম্মানজনক ও মানবিক আয়োজন প্রথমবার দেখেছেন।
কহিনুর বেগমের শিক্ষকতা জীবনের গল্পও কম অনুপ্রেরণার নয়। ১৯৮৭ সালে কলাপাড়ার চারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর একাধিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করে হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আলাদা পরিচিতি ছিল তার।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এতটাই সহজ ও আন্তরিক ছিল যে, অনেক শিক্ষার্থী তাকে শ্রেণিকক্ষেই “তুমি” বলে সম্বোধন করত। অথচ এতে কখনো বিরক্ত হননি তিনি; বরং এটিকে তিনি ভালোবাসার প্রকাশ বলেই মনে করতেন।
২০০৪ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পরও বদলায়নি তার সেই সহজ-সাবলীল আচরণ। দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও শিক্ষাবান্ধব কর্মকাণ্ডের জন্য একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৫ সালে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা সফরে শ্রীলঙ্কাও গিয়েছিলেন তিনি।
শেষ কর্মদিবসে তাই শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, যেন পুরো একটি স্মৃতিময় অধ্যায়েরই সমাপ্তি হচ্ছিল। প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবারের মতো শুভেচ্ছা জানাতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেমন ছুটে আসেন সেদিন, তেমনি বিভিন্ন কর্মস্থল থেকে সহকর্মীরাও বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। বিদায়ের মুহূর্তে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন, কেউ নীরবে চোখ মুছেছেন। আর সেই আবেগঘন আয়োজনে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মানবিক আচরণ যেন পুরো ঘটনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বাউফল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান বলেন, সরকারি দাপ্তরিক সম্পর্কের বাইরেও মানুষে মানুষে সম্মান, ভালোবাসা আর সহমর্মিতার যে জায়গা আছে, এই বিদায় অনুষ্ঠান তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২০:১৭:৫২ ২২ বার পঠিত | ● কর্মকর্তা ● বাউফল ● শিক্ষা