ঢাকা    সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
• গোলাপি স্যাটিনে জয়ার মায়াবী রূপ, মুগ্ধ ভক্তরা • ভারতের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ নাহিদ ইসলামের • সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে ভাষা বদলের চেষ্টা করছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি: রিজভী • জেন্ডার সমতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তায় লালমোহনে তরুণদের প্রশিক্ষণ • পানিসম্পদমন্ত্রীর সফরে সুজানগরে আসলাম মন্ডলের নেতৃত্বে বিএনপির বিশাল মিছিল • ১৬৯ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর লালমোহন ছাত্রদল নেতা শরিফ বহিষ্কার • ভেড়ামারায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকার নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে ধ্বংস • জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা ব্যারাজ উদ্বোধনের আশা পানিসম্পদমন্ত্রীর • মুকসুদপুরে মাছবোঝাই পিকআপের চাপায় বাবা-মেয়ের মৃত্যু, আলফাডাঙ্গায় শোক • ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবিতে ৩ নভেম্বরের সমাবেশে প্রস্তুত রংপুরের শিক্ষকরা


আপনার এলাকার খবর
প্রচ্ছদ » খুলনা » কয়রায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থার নাম প্যারামেডিক মনোয়ার হোসেন

কয়রায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থার নাম প্যারামেডিক মনোয়ার হোসেন


তারিক লিটু,কয়রা ( খুলনা )
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


কয়রায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থার নাম প্যারামেডিক মনোয়ার হোসেন

খুলনা: সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষের জীবন নদী, খাল ও বিস্তীর্ণ জনপদ ঘিরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাটে। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনো লবণাক্ততা, আবার কখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অভাব—সব মিলিয়ে এখানকার মানুষের জীবন যেন দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে অসুস্থ হলে সেই সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভালো চিকিৎসকের কাছে যেতে অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কয়রা সদর থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। জরুরি প্রয়োজনে রাতে চিকিৎসক পাওয়া কিংবা দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো অনেক পরিবারের জন্যই বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
এমন বাস্তবতায় কয়রার মানুষের কাছে ভরসার একটি নাম মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন। তিনি একজন কমিউনিটি প্যারামেডিক। দীর্ঘদিন ধরে কয়রা সদরে থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে আসছেন। প্রত্যন্ত উপকূলের যেসব মানুষ সহজে চিকিৎসাসেবা পান না, তাঁদের অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও যোগাযোগের দুর্ভোগের মধ্যেও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

কয়রার মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় শুধু একজন স্বাস্থ্যসেবাদানকারী হিসেবে নয়, বিপদের সময় কাছে পাওয়া একজন মানুষ হিসেবেও। অসুস্থ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো বাবা যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন, কিংবা পরিবারের কাউকে নিয়ে কী করবেন বুঝতে না পেরে উদ্বিগ্ন হন, তখন কাছাকাছি কাউকে পাওয়া অনেক বড় স্বস্তি। মনোয়ার হোসেনের কাছে আসা মানুষের অভিজ্ঞতায় সেই স্বস্তির কথাই উঠে আসে।

কয়রার ভ্যানচালক আবু বকর বলেন, “আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মনোয়ার হোসেনের কাছে নিয়ে যাই। তিনি চিকিৎসা ও পরামর্শ দেন। পরে আমার ছেলে সুস্থ হয়ে ওঠে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য কাছাকাছি এমন কাউকে পাওয়া অনেক উপকারের।”

আবু বকরের মতো নিম্ন আয়ের অনেক মানুষের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার আগে খরচের হিসাবও বড় বিষয়। সংসারের আয় সীমিত, অথচ অসুস্থতার জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মনোয়ার হোসেনের কাছে আসা মানুষের মধ্যে রয়েছেন কয়রা সদরের বাসিন্দা, আশপাশের গ্রামের মানুষ এবং দুর্গম জনপদ থেকে আসা রোগীরাও।

কয়রার ভৌগোলিক বাস্তবতা এখানকার স্বাস্থ্যসেবার সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সুন্দরবনবেষ্টিত এই জনপদ থেকে জেলা শহরে যাতায়াত সহজ নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতেও অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বিশেষ করে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ বেড়ে যায়। যাতায়াতের ব্যবস্থা, অর্থের সংকট এবং দ্রুত চিকিৎসক না পাওয়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি ভোগান্তি।

এই সংকট শুধু কয়রার মানুষের নয়। পাশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, চাকলা ও পাতাখালীর মতো দুর্গম এলাকার মানুষও যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবা পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব এলাকার কিছু মানুষ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ নিতে কয়রায় আসেন। তাঁদের জন্য কাছাকাছি কোনো সেবাদানকারীর উপস্থিতি অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে মনোয়ার হোসেনের কাজের পরিধি বুঝতে তাঁর পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। তিনি একজন কমিউনিটি প্যারামেডিক। তাঁর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ক্ষেত্র মূলত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। তিনি এমবিবিএস চিকিৎসক নন। তাই জটিল রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কিংবা জরুরি ও গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চিকিৎসক ও উপযুক্ত হাসপাতালে রোগী পাঠানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ, নারীস্বাস্থ্য, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহার, নাক-কান-গলার রোগ প্রতিরোধ, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং চোখের রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব প্রশিক্ষণ কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রাথমিক সেবার কাজে তাঁকে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়া আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর সেবার ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।

মনোয়ার হোসেনের পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের নিবন্ধন নম্বর ৪৫৫৭। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিশুদের জরুরি রোগ ও রোগ প্রতিরোধ, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা, স্ত্রীরোগবিষয়ক সচেতনতা, কমিউনিটি স্বাস্থ্য, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের চর্চা, নাক-কান-গলার রোগ প্রতিরোধ, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা এবং চোখের রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে এসব প্রশিক্ষণের গুরুত্ব রয়েছে। অনেক সময় গ্রামের মানুষ রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানেন না, কখন হাসপাতালে যেতে হবে তা বুঝতে পারেন না, কিংবা ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে তাঁরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

কয়রার মানুষের জন্য মনোয়ার হোসেনের মতো কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে খুব বেশি দূর যেতে হয় না। প্রত্যন্ত এলাকার কোনো পরিবারে শিশু অসুস্থ হলে কিংবা প্রবীণ কারও শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে পরিবারের সদস্যরা প্রথমেই কাছাকাছি সাহায্য খোঁজেন। সেই সহায়তা দ্রুত পাওয়া গেলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ সহজ হতে পারে। প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।

তবে একজন মানুষের আন্তরিকতা দিয়ে একটি এলাকার সব স্বাস্থ্যসংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কয়রায় প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা, সচল অ্যাম্বুলেন্স এবং দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য সহজ যোগাযোগব্যবস্থা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত জনপদে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। বিশেষ করে রাতে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকা দরকার।

মনোয়ার হোসেনের কাজের গল্প তাই শুধু একজন প্যারামেডিকের ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিবরণ নয়; এটি উপকূলীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতাও তুলে ধরে। এখানকার মানুষের প্রয়োজন শুধু ওষুধ কিংবা পরামর্শ নয়, এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা—যেখানে অসুস্থ হলে দূরত্ব, অর্থ কিংবা রাতের অন্ধকার চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

সুন্দরবনের পাশে বসবাসকারী মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকেন। সেই জনপদে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মনোয়ার হোসেন তাঁর সামর্থ্য ও প্রশিক্ষণের সীমার মধ্যে থেকে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর কাছে আসা মানুষের অভিজ্ঞতা সেই প্রচেষ্টার কথাই তুলে ধরে।

মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন বলেন, “কয়রার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যে বসবাস করছেন। এখানে অনেক দরিদ্র মানুষ আছেন, যাঁদের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসক দেখানো কিংবা চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন। বিশেষ করে রাতের বেলায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এসব মানুষের কষ্ট আমাকে নাড়া দেয়। আমি আমার সামর্থ্য ও প্রশিক্ষণের মধ্যে থেকে তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। অনেক সময় সামান্য পরামর্শ কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমেও মানুষকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়। আমি চেষ্টা করি, কেউ যেন শুধু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরামর্শ থেকে বঞ্চিত না হন। মানুষের মুখে স্বস্তি দেখতে পারা, তাঁদের উপকারে আসতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি চাই, কয়রার মানুষ যেন সহজে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পান। আমার একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তবে যত দিন পারি, মানুষের পাশে থেকে তাঁদের সেবা করে যেতে চাই।”

তবে কয়রার মানুষের প্রত্যাশা আরও বড়। তাঁরা চান, চিকিৎসার জন্য যেন আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে ছুটতে না হয়, রাতে অসুস্থ হলেও যেন চিকিৎসক পাওয়া যায় এবং অর্থের অভাবে যেন কোনো পরিবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।

সুন্দরবনঘেরা কয়রায় চিকিৎসাসেবার সুযোগ আরও বাড়াতে হলে মনোয়ার হোসেনের মতো স্থানীয় পর্যায়ের সেবাদানকারীদের ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিকতা যেমন মূল্যবান, তেমনি প্রত্যেকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৪৩:০০   ১০ বার পঠিত  | ●   ●   ●   ●







খুলনা থেকে আরও...


● ভেড়ামারায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকার নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে ধ্বংস
● কয়রায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থার নাম প্যারামেডিক মনোয়ার হোসেন
● ভেড়ামারায় আধুনিক কসাইখানা নেই, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ
● হৃদরোগে জরুরি সহায়তা দিতে ২৫ সদস্যকে সিপিআর প্রশিক্ষণ
● খুলনায় একই দিনে মুদি দোকানি ও যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ



আর্কাইভ