ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
ময়মনসিংহ: সন্ধ্যার পর নানু হাতের খাবার খেয়ে বাল্যবন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে বের হয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়–য়া মুনতাসির ফাহিম (২২)। কিন্তু সে হয়তো জানতো না তার ওই বাল্যবন্ধুই মৃত্যুর পরোয়ারা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। দেখা হওয়ার পর খুব বেশি একটা সময় হয়তো নেয়নি বাল্যবন্ধু অনিক, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে ফাহিমকে খুন করে। অতঃপর থানায় আত্মসমর্পণ করে অনিক।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানা সংলগ্ন সরকারি নজরুল একাডেমি মাঠে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ত্রিশাল সদর ইউনিয়নের চিকনা মনোহর গ্রামের বাদল মিয়ার বড় ছেলে মুনতাসির ফাহিম। পৌরশহরের দরিরামপুর কোটভবন এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ওই এলাকার বাসিন্দা জহিরুল হক মন্ডলের ছেলে অনিক মন্ডলের সঙ্গে ফাহিমের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে।
ওই দুই বাল্যবন্ধু ত্রিশাল নজরুল একাডেমি থেকে এসএসসি পাশ করে। তাদের দুজনের মধ্যে মুনতাসির ফাহিম ছিল এক স্বপ্নবাজ তরুণ, চোখে বুনে ছিল অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন। নানুর ভালবাসা ও সহযোগিতায় স্টুডেন্ট ভিসায় বছরখানেক আগে মালয়েশিয়ার সিটি ইউনিভার্সিটিতে স্মাতকে পড়াশোনা করতে যায় সে। পরিবারের আশা, নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পথ, সবই যেন ঠিকঠাক ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় চার মাস আগে দেশে এসেছিল ফাহিম। দেশে আসার পর থেকে কোনাবাড়ী গ্রামের জিরোপয়েন্ট এলাকায় নানুর কাছেই বেশি সময় থাকতো সে। নতুন সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ২৫ ডিসেম্বর থেকে। তাই আজ শনিবারই ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু নিয়তির কাছে হেরে যায় ফাহিম।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নানু হাতের খাবার খেয়ে বাল্যবন্ধু অনিকের সঙ্গে আড্ডা দিতে বের হয়েছিলো ফাহিম। অজানা এক শত্রুতার জের ধরে চাইনিজ কুড়াল নিয়ে সরকারি নজরুল একাডেমি মাঠে ফাহিমের জন্য অপেক্ষা করছিল অনিক। দেখা হওয়ার পর অনিক মাঠের পূর্বপাশে একটা নিরিবিলি স্থানে ফাহিমকে নিয়ে যায়। সেখানে একটা পানির ট্যাংকির আড়ালে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে বাল্যবন্ধু ফাহিমকে নৃশংসভাবে খুন করে। অতঃপর রাত ৯টার দিকে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে অনিক। সে পুলিশকে জানালো “ফাহিম আমার জীবন নষ্ট করেছে, তাই তাকে কুপিয়ে হত্যা করেছি।”
রাতের অন্ধকারে পুলিশ ছুটে যায় সরকারি নজরুল একাডেমির মাঠে। অনেকক্ষণ ধরে খোজাঁখুজির পর পানির ট্যাংকির পাশে পড়ে থাকতে দেখে ফাহিমের নিথর দেহ। তার লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। ততক্ষণে খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসে ফাহিমের মা ফাতেমা খাতুন ও বাবা বাদল মিয়াসহ স্বজনরা। তাদের আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ থানার সামনে জড়ো হয়।
পুলিশ রাতেই ফাহিমের লাম ময়না তদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করেন। ওই ঘটনায় ফাহিমের বাবা বাদল মিয়া বাদী হয়ে অনিক ও ইব্রাহিম নামে একজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে ত্রিশাল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ময়না তদন্ত শেষে পুলিশ শুক্রবার দুপুরে পরিবারের কাছে ফাহিমের মরদেহ হস্তান্তর করলে বাদ এশা জানাজা নামাজ শেষে নানুর বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়। এদিকে ঘাতক অনিককে আদালতে সোপর্দ করলে, সে আদালতের কাছে শিকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
স্থানীয় রাকিবুল ইসলাম বলেন, একজন মায়ের বুক খালি হলো, একজন বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলো। পরিবারটি অন্ধকারে ডুবে গেল। বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন! এরচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কিছু হতে পারে কি ? আমরা চাই অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি, চাই ফাহিমের জন্য ন্যায়বিচার।
ফাহিমের বাবা বাদল মিয়ার দাবি, এঘটনায় যেন খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের অন্যান্য যারা জড়িত আছে, তাদেরকে সনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে।
ঘটনা নিশ্চিত করে ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনসুর আহাম্মেদ বলেন, হত্যাকান্ডের পর থানায় এসে ঘটনার বর্নণা করেছে ঘাতক অনিক মন্ডল। এ সময় অনিক জানিয়েছে নিহত ফাহিম তার অনেক ক্ষতি করেছে। এ কারণে ফাহিমকে খুন করেছে সে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।
এস/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২২:০৭:১৬ ১০২ বার পঠিত | ● কুপিয়ে ● কুড়াল ● ত্রিশাল ● হত্যা