ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম
চারদিকে পানি। সামনে নদী, পেছনে খাল, আশপাশে চিংড়িঘের। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে পুকুর। তবু এক গ্লাস নিরাপদ খাবার পানির জন্য হাহাকার করতে হয়। মিঠা পানির উৎসের সন্ধানে কখনো হাঁটতে হয় এক-দুই কিলোমিটার, কোথাও তারও বেশি।
খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলঘেঁষা বহু গ্রামের নারীদের প্রতিদিনের বাস্তবতা এমনই। সংসারের অন্য কাজের পাশাপাশি খাবার পানির ব্যবস্থা করাও যেন তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কাঁখে কলসি, হাতে জার—ভোর কিংবা সকালেই বের হতে হয় পানির সন্ধানে। একটি উৎসে ভিড় বেশি হলে ছুটতে হয় অন্য উৎসে।
উপজেলা সদরের গোবরা গ্রামের নার্গিস সুলতানার ভাষায়, বর্ষাকালেই কেবল পানির কিছুটা স্বস্তি আসে। বৃষ্টি থামার কয়েক মাস পর আবার শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার।
কয়রার বিভিন্ন এলাকার পানির উৎসে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে অগভীর নলকূপের পানি অনেক জায়গায় পানযোগ্য নয়। কোথাও গভীর নলকূপেও মিঠা পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পুকুর, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক এবং সীমিতসংখ্যক মিঠা পানির উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে মানুষকে। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, কয়রায় পানীয় পানির ৫৫.৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, পানীয় পানির উৎসগুলোর অর্ধেকেরও বেশি লবণাক্ত।
এক কলসি পানির জন্য দীর্ঘ পথ
কয়রার মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, বাগালী ও উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মিঠা পানির সংকট দীর্ঘদিনের। কোনো কোনো এলাকায় একটি মাত্র নলকূপে মিঠা পানি পাওয়ায় আশপাশের বহু পরিবার সেখানে ভিড় করে। ফলে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতেও অপেক্ষা করতে হয়।
একটি গবেষণাভিত্তিক পানি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়রার কিছু এলাকায় নারীদের ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, বৃষ্টির পানি বর্ষাকালে ভালো উৎস হলেও শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টির অভাব এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণক্ষমতার ট্যাংক না থাকায় তা সারা বছর ব্যবহার করা কঠিন। অর্থাৎ সংকট শুধু পানির উৎসের নয়; সংকট হলো সারা বছর নিরাপদ পানি ধরে রাখার সক্ষমতারও।
লবণাক্ততার সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
উপকূলীয় বাংলাদেশের পানীয় জলে লবণাক্ততা ও উচ্চ সোডিয়ামের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের পানীয় জলের সোডিয়াম মাত্রা ও রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় ১,০০০ মিলিগ্রাম/লিটারের বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারী নারীদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি ছিল।
এর আগে উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলোতেও পানীয় জলের লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় উচ্চ লবণাক্ত পানির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকির সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে স্থানীয়ভাবে কারা কোন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, তার সঙ্গে পানির লবণাক্ততার সরাসরি সম্পর্ক নির্ণয় করতে কয়রায় নিয়মিত পানি পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যতথ্যের সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন।
বৃষ্টিই যখন প্রধান ভরসা
কয়রার অনেক পরিবারের কাছে বর্ষার প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যেন ভবিষ্যতের পানির মজুত।
বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি ট্যাংকে ধরে রাখা হয়। কিন্তু ছোট ট্যাংকে সারা শুষ্ক মৌসুমের পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। আবার ট্যাংক না থাকলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সুযোগও সীমিত।
পানি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর গবেষণাতেও বলা হয়েছে, বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে কয়রার মানুষের সারা বছরের পানির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু এসব ব্যবস্থার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীলতা বড় চ্যালেঞ্জ।
পুকুর আছে, কিন্তু সব পুকুর নিরাপদ নয়
কয়রায় পুকুরভিত্তিক পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোথাও পুকুরের পানি ফিল্টার করে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনেক পুকুরে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়া, দূষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিরাপদ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পুকুর স্যান্ড ফিল্টার বা পিএসএফ স্থাপন করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেকগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে অবকাঠামো তৈরি করাই শেষ কথা নয়। প্রশ্ন হলো—কে সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করবে, কতদিন করবে এবং নষ্ট হলে মেরামতের টাকা আসবে কোথা থেকে?
সরকারের উদ্যোগ, তবু ঘাটতি রয়ে গেছে
সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক বিতরণ, পুকুর খনন ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়রায় লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় গভীর নলকূপও কার্যকর নয়; তাই ভূ-উপরিস্থ পানি ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি ট্যাংক দেওয়া বা একটি পুকুর খনন করলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হয় না। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির প্রবেশে মিঠা পানির উৎস নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
এনজিওদের ভূমিকা: প্রকল্প আছে, টেকসই ব্যবস্থাপনা কতটা?
কয়রার পানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, কমিউনিটি পানি ব্যবস্থা, পিএসএফ এবং পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনজিও ফোরামের ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় খুলনা ও সাতক্ষীরায় জলবায়ুজনিত লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় শত শত কমিউনিটি রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা স্থাপন এবং নারী-নেতৃত্বাধীন পানি ব্যবহারকারী দল গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ পানি সংগ্রহে নারীদের সময় ও শারীরিক শ্রম কমাতে সহায়তা করেছে।
কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেই অবকাঠামোর কী হবে—এ প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সরেজমিনে কয়রা উপজেলা সদরের মদিনাবাদ ও দেয়াড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এনজিওগুলোর দেওয়া কয়েকটি পানি সরবরাহ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর সময় যে গুরুত্ব থাকে, পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে সেই নজর থাকে না। ফলে কমিউনিটিভিত্তিক অনেক পানি প্রকল্প কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু প্রকল্পভিত্তিক পানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন। প্রকল্পের শুরুতেই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব, তহবিল ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্ধারণ করা না গেলে কোটি টাকা ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
সমাধান কোথায়?
কয়রার পানির সংকটের স্থায়ী সমাধান একক কোনো প্রযুক্তিতে নেই। প্রয়োজন বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
প্রথমত, ইউনিয়নভিত্তিকভাবে কোথায় কতটা লবণাক্ততা রয়েছে, কোন পুকুর সারা বছর ব্যবহারযোগ্য এবং কোথায় ভূগর্ভস্থ মিঠা পানি পাওয়া যেতে পারে—তার নিয়মিত বৈজ্ঞানিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গ্রামে বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু বর্ষার পানি ধরে রাখলেই হবে না; শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত সেই পানি নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, যেসব পুকুরে মিঠা পানি সংরক্ষণ সম্ভব, সেগুলোকে কমিউনিটি নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। পিএসএফ স্থাপনের পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার, মেরামত ও পানির মান পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, পানি সংগ্রহের বোঝা যেহেতু মূলত নারীদের ওপর পড়ে, তাই পানি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় নারীদের সরাসরি যুক্ত করতে হবে।
সবশেষে প্রয়োজন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ কয়রার পানি সংকট শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়—এটি জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য, নারী শ্রম এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যতই উপকূলের ভেতরে ঢুকুক, মানুষের পানির অধিকার যেন তার সঙ্গে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কয়রার নারীদের হাতে কলসি নয়, নিরাপদ পানির কল পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে মানবিক শুরু।
তারিক লিটু,
সাংবাদিক ও প্রধান সমন্বয়ক,সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৫৪:০১ ৬ বার পঠিত | ● কয়রা ● তবু তৃষ্ণা মেটে না ● পানি আছে