ঢাকা বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বরগুনা: তালতলীতে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ মাত্র দেড় মাসের মাথায় ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়সারা কাজ এবং ভাঙনপ্রবণ নদীর তীর থেকে মাটি তুলে বাঁধ সংস্কার করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের একাংশ ধসে পড়ায় ওই এলাকার ১৫টি গ্রামের মানুষ এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া-নলবুনিয়া এলাকায় চলতি বছর পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় ৫৯০ মিটার বাঁধ সংস্কার ও জিওব্যাগ ফেলার জন্য সরকার ১ কোটি ৪৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পায় বরগুনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পপুলার কনস্ট্রাকশন, মেসার্স আর.এস. কনস্ট্রাকশন, মেসার্স মনি ট্রেডার্স এবং বরিশালের মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজ। জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় রোববার রাতে জোয়ারের সময় জিওব্যাগসহ প্রায় ৩০০ মিটার বাঁধ পায়রা নদীতে ধসে পড়ে। এ ছাড়া আরও ২০০ মিটার বাঁধে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ফাটল।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বাঁধটি আবার সংস্কার করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া, বড় অঙ্কুজানপাড়া, নলবুনিয়া ও আগাপাড়াসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, আমন ধান ও মাছের ঘের তলিয়ে কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দায়সারা তদারকির সুযোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে বেড়িবাঁধসংলগ্ন নদীর তীর থেকেই মাটি খনন করে বাঁধ সংস্কার করেছে। এ কারণে মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই বাঁধটি ধসে পড়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, জিওব্যাগে নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত বালু ভরার কথা থাকলেও নামমাত্র বালু ও মাটি দিয়ে সেগুলো ভর্তি করা হয়েছে। পরে বাঁশের খুঁটি ও টিনের বেড়া দিয়ে ডাম্পিং করা হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণেই বাঁধে ধস নেমেছে বলে দাবি তাঁদের।
তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্বাস আলী বলেন, ‘ভাঁধ ভাইঙ্গা গ্যালে মোগো ঘরবাড়ি ধান ক্ষেত সব তলাইয়া যাইবে। মোগো ধান নষ্ট অইয়া গ্যালে হারা বছর মোরা কি খামু হেই চিন্তায় আছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাবুল হাওলাদার, মো. হাসান মিয়া ও মো. নুর-আলম মাতুব্বর অভিযোগ করে বলেন, প্রতি বছরই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়সারাভাবে বেড়িবাঁধ মেরামত করে। এ কারণে বারবার বাঁধ ধসে পড়ে। তাঁরা আরও বলেন, কাজ শুরুর সময়ই অনিয়মের প্রতিবাদ জানানো হলেও কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। এখন জিওব্যাগগুলো নদীতে ধসে যাচ্ছে এবং বাঁধে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করলে ১৫টি গ্রাম তলিয়ে যাবে। এতে তাঁরা চরম বিপদে পড়বেন।
বেড়িবাঁধে ভাঙন ও ধসের ঘটনায় মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স মনি ট্রেডার্সের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অপর দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স পপুলার কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী লিমন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি নেই। যে জায়গাটিতে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেটি মূলত একটি নদীর মোহনা। মোহনার জটিল প্রকৃতির কারণে সেখানে বারবার ভাঙন দেখা দিচ্ছে। তাই নদীর এই পয়েন্টে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ ছাড়া ভাঙন রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, মেসার্স আর.এস. কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী রাসেল দায় স্বীকার করে জানান, বাঁধের একটি অংশে ধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে, এক সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশে আবার সংস্কারকাজ করা হবে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, নদীভাঙন রোধে উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়িয়া-নলবুনিয়া এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নদীর তলদেশ থেকে ভাঙন শুরু হওয়ায় শুধু জিওব্যাগ ফেলে আপাতত বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। নদীর তীর থেকে মাটি তুলে বাঁধ সংস্কারের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ এলাকায় সিসি ব্লক ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে টেকসই বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে বৈদেশিক অর্থায়ন চেয়ে প্রধান কার্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, তা দ্রুত অনুমোদন পাবে।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৩৩:২০ ২ বার পঠিত | ● তালতলী বাঁধ ধস ● তেঁতুলবাড়িয়া-নলবুনিয়া ● পায়রা নদী ● বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড