ঢাকা শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
পটুয়াখালী: পটুয়াখালী জেলা মৎস্যজীবী দলের দপ্তর সম্পাদক পদ নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর বিভ্রান্তি। অনুমোদিত জেলা কমিটির তালিকায় দপ্তর সম্পাদক হিসেবে মো. শহিদুল ইসলামের নাম থাকলেও বাস্তবে সাংগঠনিক দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল জলিল।
শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনাই নয়, সদর উপজেলা, পটুয়াখালী পৌর ও কুয়াকাটা পৌর মৎস্যজীবী দলের কমিটি বিলুপ্ত এবং জেলা কমিটির সদস্য রেজাউল চৌকিদারকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও দপ্তর সম্পাদক হিসেবে জলিলের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, জেলা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় নাম না থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে দপ্তর সম্পাদকের পরিচয়ে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন?
পটুয়াখালী জেলা মৎস্যজীবী দলের অনুমোদিত কমিটির তালিকায় দপ্তর সম্পাদক হিসেবে মো. শহিদুল ইসলামের নাম রয়েছে। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে সদর উপজেলা, পৌর ও কুয়াকাটা পৌর মৎস্যজীবী দলের কমিটি বিলুপ্ত করার যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, সেখানে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয় অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল জলিলকে।
একইভাবে জেলা কমিটির সদস্য রেজাউল চৌকিদারকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বহিষ্কারের বিজ্ঞপ্তিতেও দপ্তর সম্পাদক হিসেবে জলিলের নাম ব্যবহার করা হয়। অথচ জেলা কমিটির তালিকায় তার নাম নেই।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জলিলের সাংগঠনিক ক্ষমতার উৎস কোথায়? তিনি কি কোনো সংশোধিত বা পরবর্তী অনুমোদিত কমিটির ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি অনুমোদন ছাড়াই জেলা মৎস্যজীবী দলের দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন?
অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল জলিলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনারা জেলা কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি বা কেন্দ্রে কথা বলুন।’ তবে জেলা কমিটির তালিকায় তার নাম না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি দপ্তর সম্পাদকের পরিচয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছেন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
অন্যদিকে জেলা মৎস্যজীবী দলের দপ্তর সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্র থেকেই তাকে জেলা মৎস্যজীবী দলের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তাকে সাংগঠনিক কোনো কাজে ডাকা হয় না। অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিলকেও তিনি চেনেন না বলে দাবি করেন।
শহিদুল ইসলামের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জেলা মৎস্যজীবী দলের বিভিন্ন দপ্তরের কাজ জলিলকে দিয়ে করানো হচ্ছে। বহিষ্কার, কমিটি বিলুপ্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রমও তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
শহিদুল বলেন, ‘রেজাউল চৌকিদারকে বহিষ্কার আর কমিটি ভাঙার বিষয়টিসহ যিনি দপ্তরের কাজ করছেন, সেগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। তার থেকে টাকা নিয়ে এ পদের সব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে কিছু ব্যক্তি দলের নাম ক্ষুণ্ন করছেন।’ তবে অর্থ লেনদেনের এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
জেলা মৎস্যজীবী দলের সদস্য রেজাউল চৌকিদারকেও দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তবে কেন তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেছেন।
রেজাউলের অভিযোগ, যে ব্যক্তির স্বাক্ষরে তাকে বহিষ্কারের প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেই অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল জেলা কমিটিরই কেউ নন। তার দাবি, দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্যই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদকের কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি।
জেলা মৎস্যজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম তালুকদারের বক্তব্যে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। তিনি বলেন, জেলা কমিটি প্রথমে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ছিল। পরে তা ১০৫ সদস্য করা হয়েছে। ওই কমিটিতে তিনজন দপ্তর সম্পাদক রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ১০৫ সদস্যের অনুমোদিত কমিটির কপি চাইলে তিনি তা কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করার কথা বলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি জেলা কমিটিতে যদি একাধিক দপ্তর সম্পাদকই থাকেন, তাহলে তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা কী? আর অনুমোদিত কমিটির তালিকায় তা স্পষ্ট নয় কেন?
এ ছাড়া দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বহিষ্কারের ক্ষমতা কার, কোন প্রক্রিয়ায় কোনো জেলা কমিটির সদস্যকে বহিষ্কার করা যায় এবং একই পদে একাধিক দপ্তর সম্পাদক রাখার সাংগঠনিক বিধান কী—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি সাধারণ সম্পাদক।
জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি একেএম শফিকুল ইসলাম (ভিপি শাহীন) বিষয়টিকে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে দলীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারি। বাইরের কারও কাছে জবাবদিহি করতে আমি বাধ্য নই।’
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, একটি রাজনৈতিক দলের জেলা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় একজনের নাম দপ্তর সম্পাদক হিসেবে থাকার পর অন্য একজন ব্যক্তি একই পদবি ব্যবহার করে বহিষ্কার ও কমিটি বিলুপ্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারেন কি না।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্যজীবী দলের এই ঘটনায় এখন সামনে এসেছে একাধিক প্রশ্ন। অনুমোদিত কমিটিতে যদি মো. শহিদুল ইসলামই দপ্তর সম্পাদক হন, তাহলে অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল কোন ক্ষমতাবলে একই পদবি ব্যবহার করছেন? যদি জলিলকে পরবর্তীতে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনের লিখিত নথি কোথায়? আর যদি ১০৫ সদস্যের সংশোধিত কমিটিতে তিনজন দপ্তর সম্পাদক থাকেন, তাহলে সেই কমিটির অনুমোদিত কপি প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দলীয় পদ-পদবি ও সাংগঠনিক ক্ষমতার এমন অস্পষ্টতার মধ্যে জেলা মৎস্যজীবী দলের কমিটি বিলুপ্ত ও নেতাকর্মী বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্তগুলো কতটা বৈধ এবং গঠনতান্ত্রিক?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না মেলায় পটুয়াখালী জেলা মৎস্যজীবী দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ১৮:২৩:২৮ ১২ বার পঠিত | ● দল ● পটুয়াখালী ● মৎস্যজীবী