ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬


আপনার এলাকার খবর
প্রচ্ছদ » ঢাকা » ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা রোগীদের দুর্ভোগ

ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা রোগীদের দুর্ভোগ


ভূঞাপুর ( টাঙ্গাইল ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৫


 

ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা রোগীদের দুর্ভোগ

টাঙ্গাইল: ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানা অব্যবস্থাপনায় রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালটি যেনো এখন নিজেই এক অসুস্থ । বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট মিলিয়ে এই সরকারি হাসপাতাল এখন রোগীদের ভোগান্তির চরম আকার ধারণ করেছে।

৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে একটি জেনারেটর থাকলেও তা চালু করা হয় না। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে ডুবে যায়। চার্জিং বাল্বের ব্যবস্থা থাকলেও তা কয়েকটি বাতিতে সীমাবদ্ধ। বাকি অংশ অন্ধকারে থাকে, যা বিশেষ করে রাতে রোগী ও স্বজনদের জন্য ভীতিকর হয়ে ওঠে।

সরেজমিনে সন্ধ্যার পর হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকা চার্জিং বাতি থাকলেও লোডশেডিং চলাকালীন তা নামমাত্র। কিছুক্ষণ জ্বলার পর সেটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেন এক ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে এসময় নার্সদেরকে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে দেখা গেছে।

এদিকে প্রচ- গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু রোগীরা। এই ওয়ার্ডে আটটি ফ্যানের মধ্যে তিনটিই নষ্ট। যে কয়টি ভালো আছে লোডশেডিংয়ে ফ্যান বন্ধ থাকায় ওয়ার্ডে ভ্যাপসা গরমে শিশুরা হাঁসফাঁস করছে, স্বজনরা হাতপাখা বা চার্জার ফ্যান এনে সামান্য স্বস্তির চেষ্টা করছেন।

কর্তব্যরত নার্সরা জানান, হাসপাতালের জেনারেটর রয়েছে, কিন্তু তা চালানো হয় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাঁদের ভাষায়, বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়ার্ডে কাজ করতে গিয়ে চোখে দেখা যায় না, ওষুধ প্রয়োগ থেকে শুরু করে জরুরি সেবা পর্যন্ত ব্যাহত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক ইলেকট্রিক টেকনিশিয়ান জানান, জেনারেটর থাকলেও সেটি চালানো হয় না। আগে নিয়মিত চললেও এখন মাঝেমধ্যে স্যারদের প্রয়োজন হলে বা কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য শুধুমাত্র অফিস টাইমে চালু করা হয়। সরকার নাকি তেলের বরাদ্দ দেয়না।

জানা যায়, এ উপজেলায় প্রায় ২ লাখ মানুষের বসবাস। এসব মানুষের চিকিৎসা সেবায় একমাত্র ভরসাস্থল এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালে পরিবেশ নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে দেখা যায় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না, দুর্গন্ধময় পরিবেশে রোগী ও স্বজনদের থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। বিশেষ করে টয়লেটের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অধিকাংশ টয়লেটের ভেতরে সমস্যা, পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। পুরুষ ও নারী উভয় ওয়ার্ডের রোগীরা একই অভিযোগ করছেন। টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় অনেকেই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘টয়লেটে যাওয়ার উপায় নেই। ভেতরে প্রবেশ করাই যায় না দুর্গন্ধ আর নোংরায় ভর্তি। গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে। এমন পরিবেশে আমরা সুস্থ মানুষেরাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।’

এদিকে নার্সিং স্টেশনের পাশে থাকা মহিলাদের টয়লেটে নেই কোনো আলোর ব্যবস্থাই। একটি বৈদ্যুতিক বাতি ছিল, সেটিও দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছে না। রাতে রোগীদের বাধ্য হয়ে অন্ধকারেই প্রয়োজন সারতে হয়।

নলীন থেকে তিন মাসের শিশু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি কাজল নামে এক নারী বলেন, দুইদিন ধরে আমি হাসপাতালে আসার পর খাবার ও পানির পরিমাণ কম খাচ্ছি, যাতে টয়লেটে না যেতে হয়। টয়লেটে গিয়ে আমি এখন নিজেই অসুস্থ হওয়ার উপক্রম।

তিনি বলেন, এখানে সেবা বলতে কিছু নেই। আমি আসছি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য, এখানে এসে যদি টাকাই খরচ করতে হয় তাহলে তো এখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।

গোপালপুর উপজেলার বড়শিলা থেকে আসা রোগীর দাদী সাজেদা বেগম বলেন, এই হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ, দুর্বল! ওয়ান টাইম টেপটা পর্যন্ত কিনে এনেছি, তুলা থাকতেও বের করতে চায়না।

তিনি বলেন, গতকাল রাতে শুধু নাতিনকে হাসপাতালে আনার পর দুই আড়াই ঘন্টা কারেন্টের কোনো খবর নেই। পরে ছেলেকে বলে বাড়ি থেকে দ্রুত চার্জার ফ্যান এনেছি।

এক শিশুর মা বলেন, পাতলা পায়খানা নিয়ে আমার ৫ বছরের ছেলেকে হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক দ্রুত শরীরে স্যালাইন দিতে বলে। একবার নার্স এসে হাতে ভেইন খুঁজে না পাওয়ায় আর স্যালাইন দেওয়া হয়নি। প্রায় ২০ ঘন্টা হাসপাতালে শুয়ে থেকে শুধু মুখে স্যালাইন খাওয়ানো হয়। পরে ছেলের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হওয়ায় একজনের পরামর্শে নার্সদের কাছে জোরেশোরে বললে তখন স্যালাইন দেয়া হয়।

রোগী ও তাঁদের স্বজনরা বলছেন, হাসপাতালের পরিবেশ এতটাই নোংরা যে এখানে এক মিনিট টিকে থাকা কষ্টকর। নিরুপায় হয়ে রোগী ও স্বজনেরা কোনো রকমে এখানে সময় পার করছেন। মূলত কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারক না থাকায় হাসপাতালটিতে এই পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোতালায় উঠার সিঁড়িতে বেশ ময়লা, মেঝেতে ময়লার দাগ, দেয়ালের কোথাও কোথাও কফ, থুতু ও পানের পিকের দাগ। রোগীদের শয্যা, ওষুধ রাখার ট্রেতে মরিচা, ময়লার দাগ। এর মধ্যে মাছি উড়ছে, যা হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা আরও প্রকট করে তুলেছে।

পুরুষ ওয়ার্ডে ঢুকতেই দেখা যায় বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন কয়ড়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী। যেখানে নেই কোনো ফ্যানের ব্যবস্থাও। জানতে চাইলে তিনি জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেওয়ার পরও কেবিন বা বিশেষ সুবিধা কিছুই দেওয়া হয়নি।

আকবর আলী বলেন, এখানে টয়লেটে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। পুরুষদের টয়লেটে কমন একটি লাইট থাকলেও প্রতিটি টয়লেটে আলাদা কোনো লাইটের ব্যবস্থা নেই। ফলে মূল দরজা বন্ধ করে প্রয়োজন সারতে হয়। আর লোডশেডিং হলে পুরো হাসপাতাল অন্ধকার হয়ে যায়।

এদিকে রাতে নার্স স্টেশনগুলো প্রায়ই ফাঁকা দেখা যায়। দায়িত্বে থাকা নার্সরা অনেক সময় ওয়ার্ডে উপস্থিত না থাকায় জরুরি মুহূর্তে রোগীর স্বজনদের পড়তে হয় চরম দুশ্চিন্তায়। চিকিৎসা সহায়তা পেতে তারা তখন পুরো ভবনজুড়ে নার্সদের খুঁজে বেড়ান।

বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা এক রোগীর মা বলেন, আমার ছেলে স্যালাইন নিচ্ছিলেন। হঠাৎ টয়লেটের চাপ আসলে স্যালাইন খুলতে নার্স ডাকার দরকার পড়ে। কিন্তু স্টেশনে কেউ ছিল না। পুরো ফ্লোর ঘুরেও কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে পাশের একজনকে ডেকে এনে সেটি খুলতে হয়েছে।

এমন চিত্র শুধু একটি ওয়ার্ডেই নয়, প্রায় সব ওয়ার্ডেই কম-বেশি একই। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, রাতের বেলায় দায়িত্বে থাকা নার্সদের অনেকেই নিজেদের নির্ধারিত জায়গায় থাকেন না। এতে করে জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা বলছেন, ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন কার্যত একটি ‘অসুস্থ’ প্রতিষ্ঠান। যথাযথ নজরদারি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সরকারি এই হাসপাতালটি দিনে দিনে রোগীদের জন্য অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। তাদের দাবি, ২০২২ সালে ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সোবহান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) হিসেবে যোগদানের পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়।

কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডা. সোবহান প্রশাসনিক দিক থেকে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব পোষণ করেন। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাবর গতবছর অভিযোগ দায়ের করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারা আশঙ্কা করেন, কেউ মুখ খুললেই তাকে বদলি বা হয়রানির মুখোমুখি হতে হবে।

জানতে চাইলে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) খাদেমুল ইসলাম বলেন, সমস্যা যে নেই সেটি বলছি না। তাছাড়া আমরা কেউই শতভাগ কাজ করতে পারি না, আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি বলেন, আগে আরও বেশি ফ্যান নষ্ট ছিল, সম্প্রতি আমরা কিছু ঠিক করেছি। বাকিগুলোও সমাধানের চেষ্টা করব। তবে লাইট নষ্টের বিষয়ে আমি অবগত নই, আজই ঠিক করা হবে।

হাসপাতালের নানা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কথা স্বীকার করে আরএমও বলেন, আগে আরও খারাপ ছিল। আমাদের যে সুইপার আছে তাকে দিয়ে ওইভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয় না। এটার জন্য একজন জাত সুইপার প্রয়োজন। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে আশাকরি বিষয়টা তারা বিবেচনা করবেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে উপ‌জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার প‌রিক‌ল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সোবাহানকে কল দেয়া হলে এ নিয়ে মুঠোফোনে প্রথমে তিনি কথা বলতে চাননি। পরে বলেন, জেনারেটর থাকলেও এটার জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। তবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মাঝেমধ্যে আমরা জেনারেটর চালু করি

একপর্যায়ে টয়লেট ও হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ক্লিনারের সংখ্যা খুবই কম। একজন ক্লিনার দিয়ে হবে? বাইরে থেকে লোক ডেকে এনে ঠিক করতে হয়। আর ফ্যান-লাইট যেকোনো সময় নষ্ট হতে পারে, যখন আমার নজরে আসে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

রাতে নার্স না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ এমন অভিযোগ করেনি। এমনটি হয়ে থাকলে প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি করে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে৷

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বারান্দায় চিকিৎসা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কেবিনের ব্যবস্থা আছে, বারান্দায় থাকার কথা নয়। এটি হয়ে থাকলে তদন্ত করব। আপনি নাম ঠিকানা দিলে এখনই খোঁজ নেব।

এসময় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে টিএইচও বলেন, আমি এখন পর্যন্ত কোনো নার্সকে শোকজ পর্যন্ত করিনি। আগের আরএমও জোর করে কয়েকজন নার্সের স্বাক্ষর নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছিল।

 এল/আর

বাংলাদেশ সময়: ১৭:১১:১৭   ১৬৬ বার পঠিত  |            







ঢাকা থেকে আরও...


কালীগঞ্জে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা
মধুখালীতে গাঁজাসহ ‘হাতকাটা রাজিব’ গ্রেপ্তার
সদরপুরে নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা
দোহারে ইট ভাটায় পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন, কাটছে ফসলী জমি
ভূঞাপুরে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থীতা ঘোষণা করলেন সেলিনা



আর্কাইভ