ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আরও ১০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিরোধী দল থেকে কোনো কমিটির সভাপতি দেওয়া হয়নি।
আজ বুধবার রাতে এসব কমিটি গঠন করা হয়। এ সময় জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুসারে কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়। বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, সরকারি দল দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটাই প্রয়োগ করছে। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যদের দুয়েকজন বাদে সবাই সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। তবে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট করার ঘোষণা দেননি।
এর আগে গত রোববারও সভাপতি পদের বণ্টন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল।
জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ–সংক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল তাদের আসনসংখ্যা অনুপাতে ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে তারা এখন পর্যন্ত শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে।
বিতর্কের সূচনা
আজ দিনের শেষ কার্যসূচি ছিল সংসদীয় কমিটি গঠন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম একে একে ১০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে তোলেন। সেগুলো সংসদে পাস হয়। কিন্তু এর কোনোটিতে সভাপতি পদ বিরোধী দল থেকে দেওয়া হয়নি।
১০টি কমিটি গঠন শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, সরকারি দলের আচরণের কারণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, তাঁরা সরকারি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আসনসংখ্যা অনুপাতে বিরোধী দল ২৬ শতাংশ ভাগ পাওয়ার কথা। সরকারি দল সেটাতে একমত হয়েছে, সদস্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সেটা মানছে। বিরোধী দল আশা করে, সভাপতি পদও ২৬ শতাংশ পাবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘সভাপতি কোন দল থেকে কতজন হবে, সেটা কার্যপ্রণালিবিধিতে নেই। এটা যেভাবে বোঝাপড়া হবে সেভাবে হবে। একটা সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমাদের ১০টি সভাপতির পদ দেওয়া হবে বলে বলাও হয়েছিল। তালিকাও নেওয়া হয়েছিল।’
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, সরকারি দল টু-থার্ড মেজরিটির কারণে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই যেভাবে ডিসাইড করছে, সেটাই এখানে তারা প্রয়োগ করছে।’
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি দিলে তাদের ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে—সরকারি দলের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘এটা খুবই ইনডিসেন্ট যে সরকারি দল যখন বলে যে আপনারা এই কমিটিতে আসেন তাইলে আপনাদের এটা দিব। আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদেরকে ললিপপ দেখায়া দেখায়া আপনি নিয়ে যাবেন। আর একটা জায়গায় গিয়া আপনি আমাদেরকে অন্যভাবে ডিল করবেন।’
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি দিলে তাদের ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে—সরকারি দলের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘এটা খুবই ইনডিসেন্ট যে সরকারি দল যখন বলে যে আপনারা এই কমিটিতে আসেন, তাইলে আপনাদেরকে এটা দিব। আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদেরকে ললিপপ দেখায়া দেখায়া আপনি নিয়ে যাবেন। আর একটা জায়গায় গিয়া আপনি আমাদেরকে অন্যভাবে ডিল করবেন।’
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সরকারি দল শতভাগ সভাপতি পদ নেবে, এই সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না। এটা সংবিধানে নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছা যদি সংসদের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, এটাই স্বৈরাচার।
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ মো. তাহের বলেন, ‘স্বৈরাচার অর্থ আমি যা যা চাই এটাই আইন, এটাই আমার আচরণ হবে। আমরা এই পার্লামেন্টকে এভাবে দেখতে চাই না।’
সংসদে ও বাইরে বৈষম্য সৃষ্টি না করার আাহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ‘আমরা আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাচ্ছি না।’
বিরোধী দলকে কোনো সভাপতি পদ না দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, সামনে কমিটি গঠনে এমন হলে তাঁরা সংসদে না–ও থাকতে পারেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্য শেষে বিরোধী দলের সদস্যদের আসন ছেড়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায়। তবে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজন কক্ষ ত্যাগ করেননি।
এ পর্যাযে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি এখন জবাবটা শুনতে চাচ্ছেন না। সম্ভবত ওয়াকআউট নয়, তবে ওয়াকআউটই।
তাহেরের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের আসনের অনুপাতিক হারে সভাপতি দেওয়া যাবে না, এটা কোথাও নেই। আবার দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। অতীতের ইতিহাসেও নেই। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে ১০টি সভাপতি দেওয়ার বিষয়েও আানুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি।
স্বৈরাচার বিষয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ সদস্য বেগম খালেদা জিয়ার ছিল। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করেনি। অতীত তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপির যখন দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে এবং সরকার গঠন করে, তখন গণতন্ত্রের পদ্ধতিকে সুদৃঢ় করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিএনপি সেখানে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি আসনের সংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিএনপি এখানো অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, সংবিধান সংশোধিত হলে তারপর কমিটিগুলো তখন পুনর্গঠন করা হবে। আনুপাতিক হারে বিরোধী দল সভাপতি পাবে।
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল নাম না দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল কোনো সহযোগিতায় আসছে না। এটা সাংঘর্ষিক।
বিরোদী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা বাইরে রাজনীতি না করে সংসদে আসুন। এখানেই কথা বলি। যদি সংবিধান সংশোধনীর জায়গায় আপনারা যদি সংস্কার বলতে আপনাদের আরাম লাগে, তাহলে তা–ই বলবেন। কিন্তু সংশোধনী হিসেবে তো সংসদীয় ভাষায় এখানে অ্যামেন্ডমেন্টটা গৃহীত হতে হবে।’
জুলাই সনদে যা আছে
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। সংবিধানে এই বিধান যুক্ত করা হবে। জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করতেই হবে এমন নয়। সরকার চাইলে এখনই এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে দেওয়া হবে, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও নির্ধারণ করে দেওয়া নেই।
অন্যদিকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জুলাই সনদ অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ধারণাগত মতভিন্নতা আছে।
সভাপতি যাঁরা
কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শিক্ষকনেতা সেলিম ভূঁইয়া, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সেলিমা রহমানকে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ রকিবুল ইসলামকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে কলিম উদ্দিন আহমেদকে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আমানউল্লাহ আমানকে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ জি কে গউছকে, ভূমি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নাসের রহমানকে এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে রফিকুল ইসলাম জামালকে।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫৭:২১ ৬ বার পঠিত | ● কমিটি ● গঠন ● স্থায়ী