ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
আজ ২ সেপ্টেম্বর হলিউড অভিনেত্রী সালমা হায়েকের জন্মদিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে মেক্সিকোতে নেওয়া অভিনেত্রী আজ ৬০ বছরে পা দিয়েছেন। মেক্সিকোর টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ থেকে হলিউডের অন্যতম পরিচিত লাতিনা তারকা হয়ে ওঠার পথটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। অভিনয়ের শুরু, ভাষা ও পরিচয়ের বাধা, বয়স, উচ্চতা নিয়ে হতাশা, হলিউডের ক্ষমতাবানদের চাপ—সবকিছু পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রযোজক-পরিচালক পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
শুরুতেই আপত্তি
কৈশোরে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও বিষয়টি পরিবারকে জানাতেই সংকোচ বোধ করতেন হায়েক। এভাবেই চলে যায় দীর্ঘ সময়। তিনি মেক্সিকোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। একসময় তাঁর পরিকল্পনা ছিল কূটনীতিক হওয়ার। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে বাবাকে জানান, অভিনয় করবেন। আবারও বাবার আপত্তি। একসময় তিনি চেয়েছিলেন, মেয়ে অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাক। শেষ পর্যন্ত হায়েক অভিনয়ের ক্লাস শুরু করেন এবং একাডেমিক পড়াশোনায় আর মনোযোগী হননি।
![]()
শুরু মেক্সিকোতে
টেলিভিশনে অভিনয় দিয়ে পথচলা শুরু হয়। কিন্তু কাজ পেতে অনেক সময় লেগে যায়। নাম লেখান নাটকে। মেক্সিকোর ‘টেলিনোভেলা’ সিরিজের তেরেসা চরিত্র তাঁকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া সিরিজটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হন। পরে মেক্সিকোর সিনেমায় কাজ করার পাশাপাশি থিয়েটারেও অভিনয় করেন। কিন্তু সেখানেও ছিল নতুন বাধা—তীব্র মঞ্চভীতি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কখনো কখনো মঞ্চে উঠতেই তাঁর এতটা ভয় লাগত যে তাঁকে পার্কিং এলাকা থেকে টেনে নিয়ে যেতে হতো।
মেক্সিকো থেকে হলিউড
১৯৯১ সালে সালমা লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান। উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি শেখা এবং হলিউডে অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু তখন বিদেশি, বিশেষ করে লাতিনা অভিনেত্রীর জন্য হলিউডে প্রধান চরিত্র পাওয়া ছিল কঠিন। তাঁর নিজের ভাষায়, অনেকেই তাঁর হলিউডে বড় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তিনি সুযোগ খুঁজছিলেন অভিনয়ের। কিছু কাজের পরে তিনি ১৯৯৫ সালে ‘ডেসপেরাডো’ সিনেমায় অ্যান্টোনিও বান্দেরাসের বিপরীতে অভিনয় করে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর ‘ফ্রম ডাস্ক টিল ডন’, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’, ‘ডগমা’ সিনেমাগুলো তাঁকে আলোচিত করে। এর কারণ নিয়ে এন্টারটেইনমেন্ট উইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর চেহারাই তাঁকে হলিউডে সুযোগ পাওয়ার দরজা খুলে দিয়েছিল। শুরুতে তাঁর সৌন্দর্য ও শারীরিক আবেদন নিয়েই বেশি আলোচনা হতো। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন, মানুষ যেন তাঁর অভিনয় ও মেধাকেও গুরুত্ব দেয়।
![]()
‘ফ্রিদা’ বদলে দেয় সব
সালমা হায়েকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘ফ্রিদা’। ২০০২ সালের মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি এটি প্রযোজনাও করেন। এটি তাঁর বহু বছরের স্বপ্নের প্রকল্প ছিল। সিনেমাটি ছয়টি অস্কার মনোনয়ন পায়। হায়েক পান সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন, যা তাঁকে এই বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম মেক্সিকান অভিনেত্রীতে পরিণত করে। কিন্তু ছবিটি তৈরি করাই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা। ছবিটির প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হলিউড প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিন। ২০১৭ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধে হায়েক অভিযোগ করেছিলেন, সিনেমাটি নির্মাণের সময় ওয়াইনস্টিন তাঁর ওপর যৌন হয়রানি, চাপ ও হুমকি প্রয়োগ করেছিলেন। হায়েকের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সিনেমাটি শেষ করার জন্য আমাকে এমন একটি নগ্ন যৌন দৃশ্যে অভিনয় করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল, যা মূল চিত্রনাট্যে ছিল না।’ সেই দৃশ্যের শুটিংয়ের দিন তাঁর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল—শরীর কাঁপছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং তিনি কাঁদছিলেন। তবে প্রযোজক ওয়াইনস্টিন তাঁর অভিযোগের বেশ কিছু অংশ অস্বীকার করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, সিনেমার প্রয়োজনে কিছু দৃশ্য তিনি করিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি হায়েকের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মাইলফলকগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
৩০ বছর বয়সে ভেঙে পড়েছিলেন
সালমা হায়েকের জীবনের আরেকটি কঠিন সময় এসেছিল ৩০ বছর বয়সে। ২০১৬ সালে মেক্সিকোর ইআই ইউনিভার্সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ৩০ বছর পূর্তির দিন তিনি কেঁদেছিলেন। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, এই বয়সে এসে তাঁর আরও বেশি সাফল্য পাওয়ার কথা ছিল। নিজেকে ব্যর্থ, একাকী, কিছুটা পথহারা ও ভীত মনে হয়েছিল তাঁর। ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও ভয় ছিল। ভেবেছিলেন কাজ পাবেন না। তবে জীবনের ৪০-এর দশকে এসে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, জীবন নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী সব সময় এগোয় না এবং সেটি মেনে নেওয়ার মধ্যেও একধরনের শান্তি আছে।
অভিনেত্রীর পাশাপাশি প্রযোজক
হায়েক শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে আটকে রাখেননি, তিনি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে লাতিনা মানুষ ও নারীদের গল্প বলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।‘ফ্রিদা’র পাশাপাশি ‘আগলি বেটি’সহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের সঙ্গে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। পরে পরিচালনায়ও হাতেখড়ি হয় তাঁর। ২০০২ সালের টেলিভিশন চলচ্চিত্র ‘দ্য মালদোনাদো মিরাকল’ পরিচালনা করে তিনি এমি পুরস্কার জেতেন।
কত টাকার মালিক সালমা হায়েক
সালমা হায়েকের নির্দিষ্ট বার্ষিক আয় বা পারিশ্রমিকের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। তবে সেলিব্রিটি নেট ওর্থের তথ্যমতে জানা যায়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলার। এ হিসাব শুধু অভিনয়ের পারিশ্রমিক নয়, প্রযোজনা, ব্যবসা থেকে এসেছে। মেক্সিকোর ‘টেলিনোভেলা’র তরুণ অভিনেত্রী থেকে হলিউডের তারকা, এরপর অস্কার মনোনীত অভিনেত্রী, প্রযোজক ও পরিচালক—সালমা হায়েকের ক্যারিয়ার তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এটি পরিচয়, লিঙ্গ, ভাষা, বয়স ও ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্পও। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহস দিয়েছে ‘না’ শব্দ। যে কারণে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, “না” শব্দটির চেয়ে আর কিছু বেশি অপছন্দ করি না।’
সূত্র: এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি, সিবিএস নিউজ, ভ্যানিটি ফেয়ার
বাংলাদেশ সময়: ০:২৬:৫৬ ৬ বার পঠিত | ● অভিনেত্রী ● সালমা ● হায়েক