ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কৃষকের কাছে সার নেই, পেটে ভাত নেই, যুবকের কাজ নেই, বাড়িতে কোনো নিরাপত্তা নেই, ব্যাংকে টাকা নেই; অথচ একদল শুধু “খাই খাই” জিকিরে ব্যস্ত।’
শনিবার ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চে অংশ নিয়ে বগুড়ার শেরপুরে এক পথসভায় তিনি এ কথা বলেন। বিকেল পৌনে চারটায় শেরপুরের ধুনট রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভাটি হয়। সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়।
শেরপুরের পথসভায় জামায়াতের আমির বলেন, সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় দিশাহারা। কৃষি খাত সংকটে, যুবসমাজ বেকারত্বের ভার বইছে এবং আর্থিক খাতও সংকটে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
শেরপুর শহরের করতোয়া বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে পৃথক পথসভা করে এনসিপি। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারের প্রতি তাঁদের স্পষ্ট আহ্বান—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিকেল পাঁচটার দিকে বগুড়া মহানগরের মাটিডালি মোড়ে পথসভায় বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলেন কেন? আপনারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করলে আজকে লংমার্চের প্রয়োজন হতো না। সাত মাস চলে গেছে, সংসদে তিনটি অধিবেশন অতিক্রান্ত হলো। আপনারা জুলাই শহীদদের যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন, আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন নাই কেন?’
জ্বালানি–সংকটের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আপনারা বলেছিলেন গ্যাস দেবেন, বিদ্যুৎ দেবেন। এখন যিনি মহামান্য প্রেসিডেন্ট, তিনি তখন বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠে-ময়দানে। তাঁর স্লোগান ছিল, “গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।” এখন আমাদের স্লোগান হলো—“গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।” আমরা নতুন কোনো স্লোগান দিচ্ছি না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব যে স্লোগান দিতেন, সেটাই আমরা বলছি। আপনারা গ্যাস-বিদ্যুৎ দিচ্ছেন না বলেই আজকে আমাদের লংমার্চ।’
বগুড়ার পথসভায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ ছিল। আজকে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ ঘটনা শুধু একটিমাত্র ঘটনা নয়; এ সরকারের আমলে কয়েক হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের অনেককে এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। জনগণের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাস্তাঘাটে চলার সময় মা-বোনের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী এর দায় নেবেন না? সালাহউদ্দিন সাহেবের যদি ন্যূনতম লজ্জাবোধ থাকে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আজ আমরা লংমার্চ করছি কিসের দাবিতে? গণভোটের গণরায়ের দাবিতে। যে গণরায় আপনারা দিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। দুটি ভোটের একটি ভোট তারা চুরি করে নিয়েছে। ভোট চুরি করে সরকার গঠন করেছে। অন্যটির ফলাফল তারা এখন অস্বীকার করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। আপনাদের আমরা কথা দিতে এসেছি। একটি ভোটের রায় আমরা রক্ষা করতে না পারলেও গণভোটে যে রায় আপনারা দিয়েছেন, আমরা সেই রায় জীবন দিয়ে হলেও বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন করব।’
সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী সদরের চৌমাথা মোড়ে পথসভা করেন ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা। পথসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘যদি সরকার দাবি মেনে নেয়, তাহলে আমাদের লংমার্চ কিংবা কোনো কর্মসূচি পালন করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু দাবি না মানলে আজকে ৮ দফা, কালকে হতে পারে ৯ দফা, এরপরে যুক্ত হতে পারে ১০ দফা—আমরা জানি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব দফা পরিণত হবে এক দফাতে। আমরা সেই এক দফা এখন চাচ্ছি না। আমরা সরকারকে সময় দিচ্ছি। শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যদি উদয় না হয়, তাহলে “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সয়ে, তব পাপ যেন তারে সমভাবে দহে”—আমরা এই পাপের ভাগ দিতে রাজি হব না।’
গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ও গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে পথসভায় এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
এর আগে দুপুর ১২টায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় পথসভা করেন ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা। পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন কোনো দল ও গোষ্ঠীর জন্য না; ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায় নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। যদি দাবি আদায় না হয়, যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনে যাব। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব, ইনশা আল্লাহ।’
পথসভায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সব ক্ষেত্রে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন শুরু করেছে। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। কারণ, আমরা চব্বিশের সন্তান। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আপনারা দেখিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে কোনো স্বৈরাচারের জায়গা হবে না। এই সরকার স্বৈরাচার হয়ে উঠবে, যদি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কৃষকের সার নিশ্চিত করতে না পারে। আমরা এসব দাবি আদায়ে লংমার্চ করছি।’
সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুর অভিমুখে শুরু হওয়া লংমার্চ সকাল পৌনে ১০টায় গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে পৌঁছে পথসভা করে। এরপর দুপুর ১২টায় টাঙ্গাইল শহর বাইপাস সড়কের নগর জলফৈ মোড়ে পথসভা করার পর উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গোলচত্বর, শেরপুরের ধুনট রোড বাসস্ট্যান্ড, বগুড়ার মাটিডালি ও পলাশবাড়ীতে পথসভায় অংশ নেন ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা। পরে তাঁরা গাড়িবহর নিয়ে রংপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
লংমার্চের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে আছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সার–সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। এ কর্মসূচিকে ১১-দলীয় ঐক্যের দ্বিতীয় বড় লংমার্চ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। জোটের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া, সিলেট ও ঢাকায় আরও কর্মসূচি আছে।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ২২:২২:৪৮ ১ বার পঠিত |