ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত এনসিপির নতুন কমিটিতে তাঁকে শুধু যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়। এটিকে পদাবনতি হিসেবে দেখায় কমিটি ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে দল ছাড়ার কারণ এবং এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নিজের আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন লেখেন, ‘কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। প্রায় এক বছর আগে আমি জাতীয় নাগরিক পার্টির জোট গঠনের প্রশ্নে একটা আলাদা অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য নয় এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’
তিনি আরও লেখেন, গত ১১ মাস ধরে নিজের রাজনৈতিক বোঝাপড়া অনুযায়ী এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনাও করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সংগঠনে নানা চড়াই-উতরাই থাকে। দল ভুল পথে গেলে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা তাঁর রাজনৈতিক কর্তব্য ছিল। সেই দায়িত্ব পালনে তিনি এনসিপির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দলের গৃহীত নীতিগুলোকে স্বীকৃত ফোরামে যুক্তিসংগত উপায়ে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া দলকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার অন্য কোনো গণতান্ত্রিক পন্থা ছিল না। প্রায় এক বছরের সেই সংগ্রামের ইতি টানার ঘোষণা দিয়ে তিনি লেখেন, এনসিপির পক্ষে দলের প্রারম্ভিক মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না।
পদত্যাগের সময় নিয়ে সামান্তা শারমিন লেখেন, হয়তো আরও উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন। তখন দলের কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁর পদত্যাগকে মূল্যায়ন করা সহজ হতো। তবে তাঁর মতে, এই অপেক্ষা অর্থহীন। এনসিপি কখনো কখনো বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে পারে, এমনকি জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের সিদ্ধান্তও নিতে পারে। কিন্তু তাতেও দলটি পুরোনো রাজনৈতিক ধাঁচের বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না।
সামান্তা শারমিন লেখেন, ‘দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল কখনো রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা আনার জন্য সহায়ক হবে না; বরং বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এখন সময় এসেছে, যখন দলের সঙ্গে আমার এতদিন যেসব মতপার্থক্য হয়েছে, আলাপ-আলোচনা হয়েছে, সেসব বিষয় দলের সবাই এবং দলীয় কাঠামোর বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের জানানো দরকার।’
প্রথম প্রসঙ্গ: সংস্কারের বন্ধু জামায়াত হতে পারে কি না
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষার দল হিসেবে এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো যাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। এ জন্য অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি ছিল।
1. সাংবিধানিক সংস্কার (সংবিধানে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী ভিত্তি পরিবর্তনের জন্য)।
2. আইনের সংস্কার (রাষ্ট্র পরিচালনার আইন-কানুনকে গণবিরোধী অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী করার জন্য)।
3. রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার (পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কাঠামো সংস্কার এবং এর মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের ঔপনিবেশিক রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য)।
তাঁর দাবি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটির কোনো একটিকেও নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না। দলটি প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতিও ধারণ করে না। সংগঠনটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক নয়। জামায়াতকে যতটুকু সংস্কারের কথা বলতে দেখা যায়, তা ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন থেকে বলা হয়, যা তাঁর মতে, একধরনের ভণিতা।
তিনি লেখেন, গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল ভিত্তি উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ। অন্যদিকে জামায়াত শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থীই নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই সংগঠনটির রাজনৈতিক অভিপ্রায়। এ কারণেই তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তির পরিবর্তন হয়নি।
সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, নিজেদের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে গণহত্যাকেও জায়েজ মনে করে জামায়াত। ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকার জন্য অপরাধ স্বীকার না করা এবং জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি তাদের সাংগঠনিক ও দার্শনিক ভিত্তির অংশ।
তিনি আরও লেখেন, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, যারা স্বভাবগতভাবেই উদার ও গণতান্ত্রিক এবং সংস্কারের প্রকৃত শক্তি, তারা সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় দলটিকে জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের জন্য প্রতিক্রিয়াশীল ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে এনসিপিকে বারবার এসব সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ: নির্বাচন
সামান্তা শারমিনের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সব সম্ভাবনা ছিল। এই ভূখণ্ডে ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ এমনকি ১৯৯০ সালেও এ ধরনের রাজনৈতিক নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন ঘটায়নি; বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনও এনেছিল।
তাঁর বক্তব্য, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরিয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পরিণত করতে চেয়েছে। এনসিপির সামনে সুযোগ ছিল ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ব্যর্থতার পরও পুরোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে আগ্রহী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট করা। অথবা এককভাবে হলেও একটি রাজনৈতিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এই পথে এগোতে পারলে এনসিপি বর্তমান ফলাফলের চেয়েও ভালো ফল করতে পারত বলে মনে করেন তিনি। কারণ, রাজনৈতিক নির্বাচনের ফলাফল শুধু দলীয় ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের আগের রাজনৈতিক নির্বাচনগুলো থেকেও এ শিক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু এনসিপি সেই শিক্ষা গুরুত্ব না দিয়ে একটি ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর ফলে দলটির নিজস্ব রাজনীতি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়েছে বলে তাঁর মত।
তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনি কৌশলে অংশ না নিয়েও বর্তমান ফলাফলের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দল সেই পথে হাঁটেনি। রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে নির্বাচনি জয়কে প্রাধান্য দেওয়ায় সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও এনসিপি হারিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন লেখেন, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে অন্তত ৫০০ ভোট পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ এককভাবে নতুন ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ অগণতান্ত্রিক ও পুরোনো নির্বাচনি কৌশল হিসেবে ‘বড় পার্টির সঙ্গে জোট’ করার কারণ হিসেবে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকেই ব্যবহার করা হয়েছে। সামান্তা শারমিনের ভাষায়, এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তৃতীয় প্রসঙ্গ: অভ্যুত্থানে নারীর মালিকানা ও অধিকার
সামান্তা শারমিন লেখেন, আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে নারীরা যে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, সেই আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের লড়াইয়ের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নারীরা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা।
তাঁর মতে, নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা এবং বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থানই ছিল অভ্যুত্থানে তাঁদের অংশগ্রহণের ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, প্রতিরোধও গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছে।
কিন্তু বিজয়ের পর থেকেই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক পক্ষ ও দলগুলো নারীদের সেই বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি এবং যেসব প্রতিবন্ধকতা নারীদের অংশগ্রহণ থামাতে পারেনি, বিজয়ের পর সেগুলোকেই তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে কোণঠাসা করে পুরোনো, নারীবিহীন রাজনৈতিক মাঠ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। দলটি চাইলে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত। তবে সে জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট ছিল না; সংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি। বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের অবনমন ঘটেছে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও লেখেন, গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, এনসিপি তা ধারণ করতে চায়নি। বরং পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করেছে, তাঁদের প্রতিবাদকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অথচ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা নয়, বরং দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা—এ বিষয়টি এনসিপি বিবেচনায় নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তা শারমিনের মতে, বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের উত্তরণের জন্য ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন প্রয়োজন। অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে নিতে বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের দমিয়ে রাখতে সক্রিয়।
এই ব্যবধান দূর করতে নারীদের শুধু সমান সুযোগ দিলেই চলবে না; প্রয়োজন অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ। এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা সম্ভব হতো কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।
আন্দোলনে নারীরা এমন কিছু ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে যা পুরুষের পক্ষেও সম্ভব হয় না বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন। তাঁর ব্যাখ্যা, একজন পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তখন এর প্রভাব এক রকম হয়। কিন্তু একজন নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভূমিকা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছেন। অথচ বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে বলে লেখেন সামান্তা শারমিন। আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাঁদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহারের কৌশল ছিল? নারীদের সাহস ও ত্যাগ আন্দোলনের প্রয়োজনে গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাঁদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হলে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সামান্তা শারমিনের বক্তব্য, যে অভ্যুত্থান বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তরাধিকার বহনের দাবি করা কোনো দল নিজের কাঠামোর ভেতরেই বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরুৎপাদন করতে পারে না।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করেননি; তাঁরা আন্দোলনের চরিত্রও নির্মাণ করেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীর সাহস ও প্রতিরোধকে প্রয়োজনীয় মনে করে, অথচ বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, সে শক্তি প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫২:৫২ ১ বার পঠিত | ● এনসিপি ● এনসিপি থেকে পদত্যাগ ● বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ● সামান্তা শারমিন