ঢাকা    রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম


আপনার এলাকার খবর
প্রচ্ছদ » বরিশাল » পটুয়াখালীর খামারে কোটি টাকার সাপের বিষ, নেই বাজারজাতের সুযোগ

পটুয়াখালীর খামারে কোটি টাকার সাপের বিষ, নেই বাজারজাতের সুযোগ


আঃ মজিদ খান, (পটুয়াখালী )
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬


 পটুয়াখালীর খামারে কোটি টাকার সাপের বিষ, নেই বাজারজাতের সুযোগ

পটুয়াখালী: একসময় বিষধর সাপ দেখলেই আতঙ্কে মানুষ তা পিটিয়ে মেরে ফেলত। অথচ সেই সাপের বিষই এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোটি টাকার সম্পদ। জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রধান উপাদান এই ভেনমের জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে দেশের মাটিতেই উৎপাদিত সাপের বিষ বাজারজাতের সুযোগ না পেয়ে পড়ে আছে অবহেলায়। পটুয়াখালীর এক উদ্যোক্তার গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারটি সরকারি নিবন্ধন পেলেও সহযোগিতা ও নীতিগত জটিলতায় এখনো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না এখান থেকে উৎপাদিত ভেনম।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ ও ভেনম সংগ্রহের কাজ করে আসছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারে বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ থেকে নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা হলেও তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।

খামারটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের নিজ বাড়ির সামনেই গড়ে উঠেছে সাপের এই খামার। একটি ঘরের ভেতরে ছোট ছোট খাঁচায় রাখা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। প্রতিটি খাঁচা অনেকটা লকারের মতো। সামনে লেখা রয়েছে সাপের প্রজাতির নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য। খামারের শ্রমিকরা নিয়মিত সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন। খামারটিতে রয়েছে কিং কোবরা, পাইথন, পঙ্খীরাজ, কালকুলিন, সাদা গোখরা, কেউটে, রাসেলস ভাইপার, দাঁড়াশ, বাসুয়া, পদ্ম গোখরা, বিষঝুড়ি ও গোঁড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির আড়াই শতাধিক বিষধর সাপ।

প্রবাসজীবন শেষে ২০০০ সালে দেশে ফিরে বাড়ির সামনে ছোট পরিসরে শখের বশে সাপ পালন শুরু করেন আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ধীরে ধীরে সাপের লালন-পালন ও বংশবিস্তার শুরু করেন তিনি।

এলাকার মানুষের রোষানলে পড়ে আহত হওয়া কিংবা লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপ উদ্ধার করে নিজের খামারে আশ্রয় দিতে থাকেন রাজ্জাক। একই সঙ্গে শুরু করেন সচেতনতামূলক প্রচারণা- ‘সাপ মানুষের শত্রু নয়, পরিবেশের বন্ধ ‘। বছরের পর বছর ধরে সেই শখের উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি বাণিজ্যিক খামারে। তবে পথটি সহজ ছিল না। দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি চালাচালি, অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতার পর সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে খামারটি। এর ফলে বৈধভাবে বিষধর সাপ পালন এবং সাপের বিষ সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু খামারি রাজ্জাকের অভিযোগ সহযোগিতা না পাওয়ায় বাজারজাত করা যাচ্ছে না তার খামারে উৎপাদিত ভেনম।

আ. রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সংগ্রাম করে আমি খামারটি পরিচালনা করে আসছি। এই খামারের পেছনে আমার প্রবাস জীবনের উপার্জিত সব অর্থ ব্যয় করেছি। সাপের খাবার ও শ্রমিকদের বেতন যোগাতে গিয়ে নিজের জমি বিক্রি, এমনকি স্ত্রীর গহনাও বিক্রি করতে হয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়ে গেছে। সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আমার খামারটির অনুমোদন দিয়েছে।

রাজ্জাক বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। অবশেষে অনুমোদন মিললেও বর্তমানে সরকারিভাবে কোনো আর্থিক বা কারিগরি সহযোগিতা পাচ্ছি না। বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছি। খামার পরিচালনা, সাপের পরিচর্যা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য ব্যয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তা রাজ্জাক।

খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, আর্থিক অভাবে সে আমাদের বেতনও দিতে পারে না। আমরা এখনও শুধু তার ভালোবাসায় এখানে আছি। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় সাপ উদ্ধার করতে গেলে যে ২০০-৫০০ টাকা পাই তা দিয়া কোনো রকম চলি। খামারটি ভালোভাবে পরিচালিত হলে আমরা চলতে পারতাম।

স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, এই খামারটি নিয়ে রাজ্জাক বিশ্বাসের কষ্টের শেষ নেই। জীবনের অনেক কিছু ব্যয় করেছেন এর পেছনে। দেশের এমন মূল্যবান সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।

ভেনমের উৎপাদন নিয়ে আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, আমাদের খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের ভেনম সংগ্রহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় আট কোটি টাকা। কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করার সুযোগ নেই। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এগুলো পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করতে হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ওষুধ কোম্পানি এখনো এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। আমাদের দেশের সম্পদ ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমবে। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি তারা যেন আমাদের দিকে সুনজর দেয়। সরকারের নিকট আমার দাবি, ভেনম বাজারজাত করার বিষয়ে যেন সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, আমাদের এখানকার সাপের খামারটি থেকে সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। সেই বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো। এ কারণে দেশের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে এগিয়ে আসতে হবে। সাপের খামার কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের সাপের খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত মান ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা আমাদের দেশের ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত ভেনমের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এ বিষয়ে সরকার এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় সর্বোচ্চ জৈব নিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ নীতি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যবান এমন খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম গবেষণা ও উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এতে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরও এগিয়ে যাবে

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ২১:০২:২৭   ২৮ বার পঠিত  |   







বরিশাল থেকে আরও...


মাজার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা
লালমোহনে খাটের নিচ থেকে জেলেদের ১১৭০ কেজি চাল উদ্ধার
কাঁঠালিয়ায় বিএনপি নেতা মাসুম বিল্লাহ গ্রেপ্তার
পুকুরে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের মামলা তুলে নিতে বাদীকে হুমকি
তাবিজ দেওয়ার কথা বলে ধর্ষণচেষ্টা,জামায়াত নেতা কারাগারে



আর্কাইভ