ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুড়িগ্রাম: তিস্তা পাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা মহা পরিকল্পনা এক স্বপ্নের নাম। এটি বাস্থবায়ন হলে নদী শাসন করে নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা, বিনোদন স্পটসহ স্যাটেলাইট শহর। তাই তিস্তা ঘিড়ে নদী পাড়ের মানুষের মধ্যে জেগেছে নানা স্বপ্ন।
নদী ভাঙ্গা মানুষ গুলো সেই স্বপ্ন বাস্থবায়নে মিনি ও ক্ষুদ্র শিল্প কারখানাসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গড়ে তোলার নিরন্তন চেষ্টা চালাচ্ছেন। ফলে তিস্তা নদীর চরাঞ্চলসহ দুই পাড়ের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কিন্ত আর্থিক সংকট ও সরকারী সহায়তার অভাবে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্দ্যোক্তারা ধুকছে।
অন্যদিকে,তিস্তার চরে ৭০০ একর জমিতে বেক্সিমকো গ্রুপ বানিজ্যিক ভাবে ”তিস্তা সোলার লিমিটেড ২০০ মোঘাওয়াড বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রংপুর জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করছেন ও লালমনিরহাটের ইয়ার আলী নামক একজন শিল্পপতি ৩০ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন ”আলী বাবা থিম পার্ক”(বিনোদন ষ্পট), কৃষি পর্যায়ে বানিজ্যিক ভাবে ২০০ একর জমিতে ষ্টোভরির চাষ,প্রস্তাবিত এশটি নুতন স্যোলার কোম্পানী, রামনিয়াসার চরে প্রায় ৫০০ একর জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে, রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার ৩টি ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ভাঙ্গনরোধে নদীর ”বানতীর ভাঙ্গনরোধ সতর্কতামুলক প্রকল্প কাজ”বাস্থবায়ন হওয়ায়,নদী কুলের মানুষের স্বপ্ন আর আঙ্খাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সাথে বড় বড় এসব প্রতিষ্টান দেখে স্থানীয় উদ্দ্যোক্তারাও অনুপ্রানিত হচ্ছেন।
অপার সম্ভবনার তিস্তার দুইপারের মানুষের ভাগ্য বদলের পথ যেন আর্থিক সংকটে আটকে গেছে। আর্থিক সংকট দুর করে তিস্তা ভাগ্যহত মানুষ গুলো তাদের ভাগ্যের দুয়ার খুলতে তিস্তার বিভিন্ন চর গ্রামে গড়ে উঠেছে” রয়েল দড়ি কারখানা, নজির হোসেন রঙ্গিন দড়ি কারখানাসহ বেশ কিছু গবাদি পশু ও হাস মুরগীর খামার, ভুট্টা ও আলুর চাষ। কিন্তু আর্থিক সহায়তা ও সরকারী সহযোগিতার অভাবে ক্ষুদ্র, মিনি এ সব কারখানা গুলো অর্থনৈনিক সংকটে পড়ে ধুকছে।
নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও কোন রকমে টিকে আছে নজির রঙ্গিন দড়ির কারখানাটি। শ্রমিকের চাকুরী ছেড়ে কারখানার মালিক হওয়া অদম্য সাহসী উদ্দ্যোক্তা দুই ভাইয়ের গল্পটা যেন স্বপ্নকে ছাড়িয়ে গেছে। দড়ি কারখানায় শ্রমিক হিসাবে ২০ বছর কাজ করে নিজেরাই মালিক হবেন এমন স্বপ্ন নিয়ে নিজ বাড়ীতে ৮টি মেশিন কিনে শুরু করেন দড়ি বানানোর কাজ।
শুরুটা নিজেরাই করলেও এখন তাদের কারখানায় কাজ করে ১২ জন নারী শ্রমিক। মেশিন রয়েছে ১৫টি। কিন্ত বাজারের চাহিদা মোতাবেক দড়ি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থিৈনক সংকট ও প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে মেশিন পত্র কিনতে পারচ্ছেন না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে কাঙ্খিত উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে গ্রামীন উদ্দ্যোক্তা দুই ভাইয়ের কাঙ্খিত স্বপ্ন যেন অধরা হয়ে দেখা দিয়েছে।
তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের মুখে চর রাজবল্লব গ্রামে জন্ম নজির হোসেন ও নুর আলমের। পিতা মাদরাসার নৈশ্য প্রহরী নুর মোহাম্মদ। অভাবের সংসারে দুই ভাইয়ে লেখা পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাবা। ২০০১ সালে নজির হোসেন ও ছোট ভাই এসএসসি পাশ করে বাড়ী ছেড়ে মুন্সিগঞ্জের একটি দড়ি কারখানায় ৬ হাজার টাকা বেতনে চাকুরী নেন। ২০ বছর চাকুরী করে কিছু টাকা সঞ্চয় করে। সিদ্ধান্ত নেন চাকুরী ছেড়ে বাড়ীতে দড়ির কারখানা করবে। গ্রামের নদী ভাঙ্গা মানুষের কর্ম সংস্থান করে বাস্থহারা মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফুটাবে। আর তারা হবেন মালিক। এই স্বপ্ন নিয়ে ২০২৩ সালে বাড়ী ফিরে আসেন। বাবার সাথে পরামর্শ করে নিজেদের জমানো টাকা, জমি, গরু বিক্রি ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে। ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা যোগাড় করে ৮ টি মেশিন কিনে শুর করেন দড়ির কারখানা।
নাম দেন নজির হোসেন রঙ্গিন দড়ির কারখানা। শুরুতে নিজেরাই মেশিন চালানো, মেশিন খারাপ হলে মেরামত করেন। পরে গ্রামের আগ্রহী নারীদের প্রশিক্ষন দিয়ে ৬ হাজার টাকা বেতনে ৬ জন নারী শ্রমিক নিয়োগ দেন। ধারদেনা করে আরো ৭টি মেশিন কেনেন। অল্প দিনের মধ্যে তার কারখানার দড়ির চাহিদা কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনির হাট জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্ত চাহিদার সাথে পাল্লা দিতে হলে আর ২০টি মেশিন প্রয়োজন। কিন্ত অর্থনৈতিক সংকটের কারনে মেশিন ও কিনতে পারচ্ছে না। উৎপাদন ও বাড়াতে পারচ্ছে না। নজির হোসেন বলেন, লোনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক,অর্থলঙ্নি প্রতিষ্টান, বিসিক এর কাছে গিয়েছি কেউ লোন দিতে রাজি হয়নি। শুধু কর্মসংস্থান ব্যাংক ৫০ হাজার টাকা লোন দিয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগ্ন্য। ৫০টি মেশিন হলে অনন্ত ৫০ জন শ্রমিক কাজ করতে পারবে। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে। তার স্বপ্ন পুরনে প্রধান অন্তরায় অর্থিৈনক সংকট। সে কারনে তার স্বপ্ন যেন অধরা থেকে যাচ্ছে।
নুর আলম জানান, শহরের চেয়ে গ্রামীন কারখানা গড়ে তোলা অনেক সহজ ও লাভজনক। এখানে শ্রমিক সস্তা ও সহজ লভ্ব। গ্রামের অনেক আগ্রহী উদ্দ্যোক্তা আসে দেখে, শোনে কিন্ত আর্থিক কারনে কেউ সাহস পায় না। গ্রামীন শিল্প কারখানার প্রধান অন্তরায় অর্থ। কারখানা থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত কাচা রাস্তাটি পাকা হলে কারখানার মালামাল আনা নেওয়ায় অসুবিধা হচ্ছে। পাটের মুল্য বেশী হওয়ায়, সুতা দিয়ে তৈরী প্রতি কেজি দড়ি ২৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিন ৬০/৭০ কেজি, মাসে ৪৫ মন, বছরে ৫৪০ মন দড়ি উৎপাদন হচ্ছে। যার বাজার মুল্য ৫০ লাখ টাকা। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন হলে বছরে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান। সরকারী সাহার্য,সহযোগিতা পেলে তাদের স্বপ্ন পুরন হবে বলে তার আশা। তাদের তৈরী রঙ্গিন দড়ি গবাদি পশু, বাস, ট্রাক, ভ্যান, ঠেলাগাড়ীসহ বিভিন্ন গিরস্থলী কাজে দড়ির ব্যবহার বাড়ছে।
শ্রমিক লাকী বেগম বলেন,নদী ভাঙ্গা এলাকায় কোন কাম নাই। আগে মানষের বাড়ীত কাম করে খায়া দাওয়া আধ সের চাল দিত। বাড়ীর খায়া কারখানায় কাজ করি ৬ হাজার টাকা পাই। তা দিয়ে সংসার চালাই, ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করাই। কারখানাটি বড় হলে হামার দামও বাড়বে। একই আশার স্বপ্ন বুনছেন, শ্রমিক ওসনা বেগম, জোসনা বেগম ও শামছুন্নাহার বেগমসহ অনেকে।
রয়েল দড়ি কারখানার মালিক তবারক আলী বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে কারখানাটি করেছিলাম ।কিন্ত আর্তিক সংকটের কারনে চালাতে পারচ্ছি না।
স্থানীয় এনজিও এসে দেশ গড়ির পরিচালক ও সাবেক কলেজ শিক্ষক মো. ফিরোজ আলম বলেন,নদীর অববাহিকায় এমন একটি দড়ির কারখানা স্থাপন করা অনেক বড় সাহসী কাজ। গ্রামে এভাবে শিল্প উদ্দ্যোক্তা তৈরী হলে ধীরে ধীরে গ্রাম গুলো উন্নত হবে। এ সব উদ্দ্যোক্তাদের সরকারী ভাবে পৃষ্টপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন।
কুড়িগ্রামেরর বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন,অতি শ্রুঘ্রই কারখানাটি পরিদর্শন করে আর্থিক সহায়তাতার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম আরিফ বলেন,আমি কারখানাটি পরিদর্শন করে দেখব। কারখানার সমস্যাসহ রাস্তাটিও করে দিব।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২১:৫৪:০০ ৩ বার পঠিত | ● উলিপুর ● কারখানা ● চর ● তিস্তার ● দড়ির